কবি অনুরাধা মহাপাত্র
জন্ম:-৩০ জুন ১৯৫৭।মেদিনীপুর জেলার সামসাবাদে। পড়াশোনা নন্দীগ্রাম ও কলকাতা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই তিনি কবিতা লিখতেন। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ছাইফুলস্তূপ'। ইতিমধ্যে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৪০ এরও বেশি।লেখালেখি ছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ে সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন প্রান্তিক মানুষের ভিতরে। শিক্ষকতা, গবেষণা, অনুবাদের কাজও করেছেন। তিনি আমেরিকা, ফ্রান্সে বাংলা ভাষার প্রতিনিধি স্থানীয় কবি হিসেবে কবিতা পাঠ করেছেন। তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে ফরাসি, জাপানি, ইংরেজি, স্প্যানিশ সহ বিভিন্ন ভাষায়। কবিতা রচনার জন্য পেয়েছেন 'বাংলা আকাদেমি পুরস্কার', 'কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার' কবি আলোক সরকার স্মৃতি পুরস্কার' প্রভৃতি।
নীলাঞ্জন, নীলাঞ্জন
নীলাঞ্জন নীলাঞ্জন শোনো,
দিয়োনা হে বর্ষা বিদায়।
বোলো হে অশেষ কথা রবীন্দ্রনাথের
বর্ষণমুখরিত বেতারের তারে।
শোনাও মর্মের কথা, স্বপ্নের নীলনবঘন গাথা; নীলাঞ্জন, নীলাঞ্জন, এসো এসো আষাঢ়ের নবকিশলয় নিয়ে
মহামারী-শোকে আক্রমণে ক্ষয়রোগে ম্লান
যযাতি শহরে
এসো এসো প্রভাতের নচিকেতা হয়ে ডিজিটাল গহবর পার হয়ে,
সূর্যস্নাত আস্তিকতা বয়ে।
সব পালা, নবান্ন, আকাশপ্রদীপ, ধান কাটার গান হয়ে, নববধূ চোখে,
মনসা,বগলা, চন্ডী, বিশালক্ষী পালা গান গেয়ে
বঙ্গের পথে পথে, নদীঘাটে, ঘাসে ঘাসে
অথৈ যাত্রায়।
এসো কাঞ্চনফুলে, জবা, মল্লিকা, যুঁই, নাগচম্পার নবনীড়মাখা ওই মিলিত সুধায় ।
এসো কুরচি,ঘাসশিষ, বাবলা, আর কন্টিকারী ফুলে
এসো ঘরে, জন্মে, দূর্বাদলে
এসো, আকাশে আর নদীর উপলে।
এসো কালিদাস হয়ে, এসো বিভূতিভূষণ হয়ে,
এসো বঙ্গের স্বরবৃত্তে, নতুন মুক্তকে।
বোলো হে সকল ক্ষণে স্বাগত হে দুঃখ আমার, স্বাগত বিদায়
নীলাঞ্জন, নীলাঞ্জন ওই নারকেল গাছের মাথায় হরিতাঞ্জনমাখা ছন্দিত ময়ূরপাখায়।
নীলাঞ্জন, নীলাঞ্জন বোলো কথা বৌঠান কাদম্বরীর,
শ্রাবণ আসার আগে, মেঘে মেঘে, নির্জন উধাও।
মিশমিশে তেল রং
বড়ো মেঠো চাঁদের সমান গেরি-লাল সিঁদুরে টিপ--
কপাল আর কপোলের আভাই আলাদা!
তার সঙ্গে মিশমিশে কালো তেল রং
অঘোর লাবণ্যে মিশে ঘোমটা-আড়ালে।
সরু লাল মাজা পাড় সাদা আট হাতি শাড়ি পড়ে
আমাদের চিরহৃদয়ে আঁকা পট
নন্দীগ্রামের নাথবউ অশ্বিনীর মা।
তার সাথে ভর দুককুরবেলা আমার গর্ভধারিনী--
গল্প করে যাচ্ছে দেখি আমাদের আদুরে মাটির ঘরে;
পূবদিকে ভেতরউঠোনে বসে
কত জন্মের কথা যে বলছে
পাশে বাঁশপাতায় উঠছে মর্মর,রোদও বিধুর
পাগলা বাতাস
এ সময় কারা যেন ফিসফিস করে যাচ্ছে
অদূরে পাকা ধানখেতে
যতদূর চোখ যায় শিষের নকশি-নদী
ঈষৎ সবুজের পিঠে ছলাৎ ছলাৎ বয়ে যাচ্ছে
অধিবাস, গায়ে-হলুদে মেশামেশি কত না বাসর
আর নবান্নের গান।
অশ্বিনীর মা মাজছে পাকা তেঁতুলের ক্বাথ দিয়ে
পিলসুজ,থালা, ঘড়া,নকশিগেলাস
মুখে ভাতের জামবাটি, পিতল প্রদীপ
আর কাঁসার স্বপ্নঝিনুক। ঝিকোনো নূপুর।
কত দুঃখের, ছেলে হারানোর,
খুকির ডুবে যাওয়া অথৈ পুকুরে,
পিটুলিগোলা দিয়ে খাওয়ানো
বুকের খুকিটিকে।তাহলে নবান্নের ধান সে তোলেনি ঘরে?
'আর যে চলে না, কত প্রাণ ফেটে পড়া দীর্ঘশ্বাস;
এ পোড়া কপালে আর কত সইব মা?'
তার কপালে সিঁদুরটিপের পাশে
বিন্দু বিন্দু অশ্রু ঘাম ফুটে উঠছে
এখনও দেখি।মিশে তেল রং কালো মিশমিশে।
হ্যাঁ, আছেন শিল্পী রেমব্রান্ট
শিল্পীর খাওয়ার জুটত না।
রোজ এক রেস্তোরাঁয় বসে আঁকতেন।
আর সেই সরাই-খানার মালকিন
দয়া করে দিতেন দু-এক টাকা
কিনতেন একটা কি দুটো চিত্র
সে সব ছবি
পরে টেবিলে সার্ভ করতেন খাবারের
ফয়েল পাত্র হিসেবে।
যা শেষে ফেলা হত
আবর্জনা-বাস্কেটে।
আর শিল্পী? হ্যাঁ, তিনিই
সেই দু-এক ডলার দিয়ে
কসাইখানার থেকে কিনতেন
মাংসের দু-একটা হাড়।
ঘরে ফিরে, ক্ষুধা নিবারণে
ফুটিয়ে খেতেন সেই হাড়।
আর, সেই, সে মালকিন
ওয়েস্টবক্স থেকে সে ছবি
বহু বছরে কত লক্ষ ডলারে
বেচেছে-- পৃথিবী তা জানে।
কিন্তু তখন?
মানে শিল্পী নিজেই তো ছবি।
বলা যায়, না খেয়েই মারা যান।
যিনি, নিজস্ব স্পর্ধায়
মশায়,বিকোননি নিজের মাথা।
হতে চাননি কোনো গদগদ দেশিকোত্তম
কোনো ঠগ,জোচ্চর খুনেদের
থাবার মহাজনী মুদ্রার নিচে
হ্যাঁ হুজুর,করজোড় হয়ে।
তিনি হ্যাঁ, শিল্পী রেমব্রান্ট।


Comments
Post a Comment