কবি তৌফিক জহুর

তৌফিক জহুর 

জন্ম:- ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর, বগুড়ায়। শিক্ষাজীবনে বাংলায় স্নাতক। সৃজনশীলতার হাতেখড়ি মূলত সাংবাদিকতা থেকে। কাজ করেছেন খণ্ডকালীন সাংবাদিক হিসাবে  দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক বাংলার বাণী,দৈনিক জনকণ্ঠ এবং সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন পাক্ষিক সাদাকালো, সাপ্তাহিক রোববার, সাপ্তাহিক বৈচিত্র, মাসিক এশিয়া ডাইজেস্ট এর মতো উল্লেখযোগ্য পত্র-পত্রিকায়। আল-মাহমুদ ও অন্যান্য(২০০৪)তৌফিক জহুরের গবেষণামূলক প্রবন্ধ যা সমকালে ভীষণ আলোচিত। কবিতাগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে তৃষ্ণার্ত চোখের আকুতি (২০১৬), পাখি বিক্রি কাহিনী (২০১৯), কে তোমাকে ডেকে নিয়ে যায় বারেবারে(২০২০),এ শহরে আমার কোন প্রেমিকা নেই(২০২১), নব্বই দশকের  কবি তৃষ্ণা বসাকের সাথে যৌথ কাব্যগ্রন্থ 'ঠান্ডা মাংস এবং আগুনের চুল্লি' (২০২১) ।অনুজ কবি কুশল ভৌমিক এর সঙ্গে যৌথ কাব্য গ্রন্থ " শব্দের ওন্কার"(২০২১)।
কবি তৌফিক জহুর ১৯৯৮ সাল থেকে সম্পাদনা করছেন শিল্প সাহিত্য ও দর্শনের ছোট কাগজ 'উদ্যান'।
সম্মাননা ও পুরস্কারের মধ্যে লাভ করেছেন দৈনিক বাঙ্গালীর কণ্ঠ লেখক পুরস্কার (২০১৯) এবং কবি 
জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পদক(২০২০)।

গুচ্ছ কবিতায়
কবি তৌফিক জহুর


বন্ধুর হাতে আমার বেহেস্ত 

একটা খোলা বইয়ের জগতে ডুবে ছিলাম আমরা
যেখানে ইতিহাসের ঘোড়া আর সিপাহিরা ঝিমিয়ে 
ক্লান্ত হয়ে বারবার পানির জন্য সেনাপতির নিকট 
আহবান করছিলো। মুখ তুলে অন্য একটা বইয়ে ডুবে গেলাম আমরা। এই বইয়ের পাতায় পাতায় গীর্জার ঘন্টা ধ্বনি শঙ্খের আওয়াজ আর আজানের সুমিষ্ট ধ্বনি বাজছে। আমরা একে অন্যের দিকে তাকালাম। শেলফ জুড়ে অসংখ্য বইয়ের ভেতর জ্বলতে থাকা একটা বই বের করে আনলাম। নাম বন্ধুত্ব। আমরা ডুবে গেলাম বন্ধুত্বে। আমাদের বিকেল ডুবে যায়, সন্ধ্যা আসে।আমরা বন্ধুত্বে ডুবতে ডুবতে একসময় আবিষ্কার করলাম পৃথিবীতে একজন মানুষের একটা সবুজ বৃক্ষের প্রয়োজন। একটা নদীর প্রয়োজন। নদীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে আস্ত একটা খাড়া পাহাড়। নদীটা একসময় সমুদ্রে মিশে যাওয়ার জন্য হাঁটতে থাকবে কৈশোরের অক্ষর শেখার মতো সুর করে। একটা নদী আর একটা নদী পাশাপাশি হেঁটে যখন সমুদ্রে মিশে যায়, তখন ঘোড়ার কেশরের মতো ঢেউ আছড়ে পড়ে সৈকতে। সমুদ্রের এই ভাষা পড়তে পারে নদী। নদী মানে সভ্যতা। সভ্যতা হলো বন্ধুত্বের বৃক্ষ রোপণ। একটা বন্ধুত্ব দাঁড়িয়ে থাকে গ্রানাইট পাথরের পাহাড়ের মতো। একটা বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয় আকাশ দেখে। একটা বন্ধুত্ব ভূমিকম্পের মতো ইতিহাস সৃষ্টি করে হয়ে যায় ভাওয়াল গড়। একটা বন্ধুত্ব নরম কাঁথায় শুয়ে আঁতুড়ঘর দেখে। বন্ধু যখন সন্ধ্যার আকাশে রঙধনু হয়ে যায় তখন বইয়ের জগত থেকে বেরিয়ে আমরা বলি, বন্ধুর হাতে আমার বেহেস্ত।

সড়ক

একটা সড়ক শুয়ে আছে 
রোদের চাদর মুড়ি দিয়ে 
যে পথে একটু আগে 
হেঁটে গেছে দিয়াশলাই 
আগুন জ্বেলে 
দমকল বাহিনী ছুটে এসে 
হুস পাইপে ছিটিয়ে দেয় বৃষ্টি 
সড়কে আগুন ফুল হয়ে যায় 

দিয়াশলাই ফিরে আসে মশাল হয়ে।

আম্মার আঁচলের ছায়ায় বর্ণমালা শেখা

বংশ পরম্পরায় বাবা একজন চৌধুরী 
রণাঙ্গনে ছিলেন, তাঁর মন ও চোখে 
দেখেছি বারুদের উত্তাপ 
তিনি প্রতিদিন গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতু নিয়ে পথ চলতেন 
একদিন একটা বই নিয়ে এলেন
সেই প্রথম আমি কালো রঙের বর্ণ দেখলাম
কাগজের পৃষ্ঠায় শুয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে 
আমিও একজন চৌধুরী হতে লাগলাম
বর্ণ শেখার মধ্যে দিয়ে 
আমার প্রথম শিক্ষক আমার মা 
অ আ ক খ হৃদয়ে গেঁথে দিলেন
রবীন্দ্রনাথের মতো রেলিঙ কে নয় 
বাড়ির আম আর কাঁঠালগাছ গুলোকে 
সারাদিন পড়াতে লাগলাম অ আ ক খ 
একদিন সংখ্যা শিখতে শুরু করলাম ১ ২ ৩
আম্মার পুঁথি পাঠের তেলাওয়াতে
একদিন নামতার স্বর্গে ঢুকে গেলাম 
দুই এক কে দুই, দুই দুগুণে চার
দিনরাত শুধু গুণতে লাগলাম 

এখন আমি মানুষ গুণি
গুণতে গুণতে মনে পড়ে আম্মার তেলাওয়াত 
পথে প্রান্তরে পাহাড়ে নদীতে সমুদ্রে 
আজকাল আর মানুষ খুঁজে পাইনা 
জীবন এখন তুতেনখামেনের মুখোশের আড়ালে।



Comments

Popular posts from this blog

কবি-প্রাবন্ধিক অমলেন্দু বিশ্বাস

সূ চি প ত্র

কিছু বলা কথা