কবি দীপক হালদার
দীপক হালদার
কবি সুব্রত ভুঁইয়া: সঙ্গ ও সঙ্গহীনতা
তিনি ছিলেন আজ নেই।স্থানীয় আবহাওয়ায় যদিও তাঁর নাম মিশে আছে যেরকম ছিল আগেও।ডায়মন্ডহারবারের মতো ছোট্ট মফস্বল শহরে সুব্রত ভুঁইয়া একটি নাম যাঁকে একডাকে সকলেই চেনে।চেনে,তার কারণ তাঁর কথা বলার দক্ষতা, রসিক মনোভাবের মনোগ্রাহী প্রকাশ এবং অবশ্যই গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব ।
ডায়মন্ডহারবারে তখন, সেই সাতের দশকের প্রথম পর্বে স্থানীয় পত্র - পত্রিকা বলতে ছিল গননাথ মন্ডল সম্পাদিত দখিনা,অজয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত ফুটপাত এবং একটু পরে পরে অচ্যুত হালদার সম্পাদিত বন্দর।দখিনা এবং ফুটপাত মূলতঃ সংবাদ- সাহিত্য পত্রিকা,পাক্ষিক হিসেবে প্রকাশিত হতো ।বন্দর দেখা দিল নিখাদ সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে ।সেই সময় ডায়মন্ডহারবারের একটি সুপরিচিত ক্লাব ইয়ং ফাইটার্স এর শারদীয় দুর্গোৎসবের স্যুভেনির- এ একটি বিজ্ঞাপন নজর কাড়ল সাধারণের 'শহর কাঁপিয়ে প্রকাশিত হতে চলেছে এই মুহূর্ত '। বিজ্ঞাপনটি আপাত নিরীহ মনে হলেও ওর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক অদম্য সাহসী প্রচেষ্টা ।আর এই বিজ্ঞাপন দাতার মুখ্য কারিগর ছিলেন সুব্রত ভুঁইয়া ।স্যুভেনিরে তাঁর লেখা কবিতাও ছিল । সুব্রত তখন রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মচারী।নিত্য কাজ কর্মের সেই আবহে সাহিত্য চর্চাকেও তিনি সঙ্গী ক'রে নিলেন ভালোবাসার আত্মিক প্রণোদনায়।সাহিত্যে আগ্রহী আমি তখন সদ্য কলেজ পাশ করে ডায়মন্ডহারবার থেকে বেশ খানিকটা দূরে হরিণডাঙা কুমুদিনী জুনিয়র হাই স্কুলে শিক্ষকতা গ্রহণ করেছি পেশা হিসেবে ।কলেজ ম্যাগাজিন ছাড়া স্থানীয় পত্র- পত্রিকায় কবিতা গল্প প্রকাশিত হয়েছে, হচ্ছে আমার।এরকম সময়ে একদিন বিকালে স্কুল ফেরত ডায়মন্ডহারবারের এস ডি ও অফিসের সুমুখে পথে নামছি মেন রোড থেকে ।তখন ওই পথের ডানদিকের ঢালের একটি চা দোকানের ভেতর থেকে ডাক ভেসে এল আমার দিকে ।সেখানে ভেতরে বসে ছিলেন সুব্রত ভুঁইয়া এবং বলরাম বাহাদুর ।আলাপ হল ওঁদের সাথে ।চা খেতে খেতে অনেক কথা, পারস্পরিক জানাশোনা, কে কি করি সেসব বিষয়ে আলোচনা, কি করতে চান ওঁরা সব জানাজানি হল।মোদ্দা কথাটা হলো একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করতে চলেছেন ওঁরা, সেই পথের সহ পথিক হিসেবে ওঁরা পেতে চান আমাকে ।আমি সাগ্রহে আমার সম্মতি জানানোয় ওঁরা খুশি হলেন, আমিও আনন্দিত । সুব্রতদা, যিনি দীপুদা নামে সমধিক পরিচিত, তাঁকে জানাই 'পুরনো কলেজ ম্যাগাজিনে আপনার লেখা প্রবন্ধ 'হয়েল ও নারলিকার'পড়েছি আমি।ঘটনাসূত্রে দুজনেই ফকিরচাঁদ কলেজের ছাত্র ।সুব্রত ভুঁইয়া কয়েকবছর আগে আমি বেশ কিছু পরের।কলেজ ম্যাগাজিন সম্পাদনা করতে গিয়ে পুরনো ম্যাগাজিন দেখতে দেখতে ওঁর লেখা চোখে পড়েছিল।
তারপর থেকে প্রতি রবিবার,অফিস,স্কুল ফেরত বিকেলে সন্ধ্যায় আমাদের একসাথে বসা,পত্রিকা প্রকাশে এগিয়ে চলা ।কবিতা লেখা, পড়া,আলোচনা করা নিজের নিজের মতো।পত্রিকা প্রকাশ করতে গিয়ে আলাপ হলো ডায়মন্ডহারবারের সাহিত্যিক দুই ভাই সত্যেশ্বর চট্টোপাধ্যায় ও ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়ের সাথে ।আলাপ হলো শংকর কুমার প্রামাণিক, আশিস ঘোষের সাথে ।পরিধি বাড়তে থাকল ।
কয়েক সংখ্যা 'এইমুহূর্ত' প্রকাশের পর রেজিস্ট্রেশনের জন্য দরখাস্ত করতে জানা গেল 'এইমুহূর্ত' নামে পত্রিকা আছে তাই ওই নামে পত্রিকা করা যাবে না ।এবার তিনজনে বসে ঠিক হলো অর্কেস্ট্রা নামে প্রকাশিত হবে পত্রিকা।
অর্কেস্ট্রা হবে কবিতা ও শিল্পকলা বিষয়ক । রেজিস্ট্রেশন মিলল।পত্রিকাও চলল গড়গড়িয়ে । তখন দীপুদা মানে সুব্রত ভুঁইয়াকে রোজই কবিতা লিখতে বা চর্চা করতে দেখা যেত ।বেশ কয়েকটি সমৃদ্ধ সংখ্যা প্রকাশের পর ধীরে ধীরে একসময় পত্রিকার প্রকাশ অনিয়মিত হতে হতে বন্ধ হয়ে গেল একেবারে । এসময়ে ডায়মন্ডহারবারে নেহরু যুব কেন্দ্রের কো অর্ডিনেটর হিসেবে এলেন কবি বাসুদেব দেব ।তাঁর কাছে আমাদের তিনজনের নিত্য যাতায়াতে কবিতা চর্চায় গতি বাড়ল বলরাম বাহাদুর , সুব্রত ভুঁইয়াসহ আমারও ।বাসুদেবদার ডায়মন্ডহারবার ছাড়ার সময়ে সময়ে এলেন কবি ও গল্পকার তপন বন্দ্যোপাধ্যায়।তপনদা বদলি হবার পর একদা এলেন কবি সুধীর দত্ত, একসময় কবি অমিতাভ মৈত্র ।এইসব গুনীজনদের সময়কাল পর্যন্ত সুব্রত ভুঁইয়ার কলম সচল ছিল । সুরসিক দীপুদার সদালাপী ভূমিকা বেশ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল সকলের কাছে।
ঊনিশ শ ছিয়ানব্বই সালে প্রকাশিত হলো'প্রেম দাও তমা' নামে কাব্যগ্রন্থ ।
দ্বিগুণ উদ্যমে লেখা চলতে থাকল তাঁর ।'প্রেম দাও তমা' কাব্যগ্রন্থে তাঁর রোমান্টিক মনের পরিচয় উদ্ঘাটিত ।নিজস্বতার স্বকীয়তায় আলাদা তাঁর কাব্যচেতনা ।আনন্দ এবং বাসনা সেখানে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলে।
কিন্তু এর বেশ কিছু পরে পরে তাঁর কাব্যরচনা ও চর্চায় কিছুটা ঘাটতি এবং ধারাবাহিকতার অভাব লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে । কবিমনস্ক মন যদিও একেবারে ছেড়ে যায় নি তাঁকে ।মাঝে মধ্যে লিখিত হতে থাকে কবিতা, যদিও সেখানে সপ্রকাশ মনের সপ্রতিভ একাত্মতার অভাব গ্রাস করে ।ধীরে ধীরে শরীরও ভাঙতে থাকে ।হার্টের বাইপাস সার্জারি হয়।সাহিত্য চর্চায় বিরতি ঘটে দীর্ঘদিনের ।সুস্থ হয়ে ওঠেন একসময় । আর ফিরে আসেনা তাঁর সপ্রতিভ কবিতাচর্চার মন।লেখা হয় কখনো সখনো তবু কোথাও একটা ঘাটতির মেঘ জমে থাকে সেসব রচনায়।
তবে সাহিত্য পড়া, আলোচনা শোনা বা অংশগ্রহণে অনুৎসাহ চোখে পড়ে না কখনো । এভাবে গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে থাকে দিন।আমরা, অর্থাৎ আমি,দীপুদা এবং বলরাম আড্ডা দিতাম দিনের পর দিন।একসময় বলরাম অসুস্থতার জন্য না আসতে পারলেও আমাদের দুজনের একসাথে বসা চলছিল বেশ । করোনার প্রকোপ, লকডাউন আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল প্রায় দুবছর ধরে ।সেই বিচ্ছিন্নতা চিরস্থায়ী করল গত বাইশে জুন দুহাজার একুশের শেষ রাতে ।কিন্তু চল্লিশ- পঁয়তাল্লিশ বছরের সম্পর্ককে মনের কোণের বাইরে রাখার ক্ষমতা বোধ হয় আজও আবিষ্কৃত হয়নি ।তাই দীপুদা, কবি ও মানুষ সুব্রত ভুঁইয়া বেঁচে আছেন, থাকবেন আমার ও বলরাম বাহাদুরের মতো আরও অনেকের মননের সমৃদ্ধ আধারে।




অসাধারণ স্মৃতিচারণ! মুগ্ধ বিস্ময়ে পড়া শেষ করলাম।
ReplyDeleteঅসাধারণ স্মৃতিচারণা। তোমায় ধন্যবাদ।
ReplyDelete