কবি-প্রাবন্ধিক মামুন রশিদ

 মামুন রশীদ

জন্ম:- ২ আগস্ট ১৯৭৭। সার্টিফিকেটে ১ মার্চ, ১৯৭৮।বাবার চাকরিসূত্রে শৈশব, কৈশোর কেটেছে উত্তরবঙ্গের নানা জেলায়। প্রায় আধ ডজন স্কুল পাল্টিয়ে মাধ্যমিক।বাংলায় সম্মানসহ স্নাতকোত্তর, সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এমবিএ। সহকারী সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি দৈনিকে। কাজ করেছেন সাপ্তাহিক ও পাক্ষিকেও। গদ্য ও পদ্য দুই মাধ্যমেই সচল। সমসাময়িক বিষয়ে সংবাদপত্রে নিয়মিত উপ-সম্পাদকীয় লেখেন। প্রকাশিত বইযের সংখ্যা কুড়ির অধিক।সম্পাদিত ছোটকাগজ দ্বিবাচ্য, ভুতটুস (যৌথ)।এছাড়া সম্পাদনা করেন সাহিত্যের দ্বিমাসিক কাগজ- 'নক্ষত্র'।প্রকাশিত কবিতার বই-কালো পাতা, ওড়ো, সাদাছাই;কুশল তোমার বাঞ্ছা করি;তোমার পরে মেঘ জমলে;এই বইটির কোন নাম দিবো না,সকল ভ্রমণ শেষে; আমি তোর রাফখাতা;যা কিছু লিখেছি সব সব প্রেমের কবিতা।


প্রবন্ধে                                                                        কবি- প্রাবন্ধিক মামুন রশীদ









ষাটের নিঃসঙ্গ যাত্রী সিকদার                       আমিনুল হক

সাধারণ প্রচারকের সঙ্গে কবির পার্থক্য রয়েছে। সেই পার্থক্য বর্ণনা, প্রকাশ এবং আবেগের নিয়ন্ত্রণে। সাধারণ প্রচারক আবেগের আতিশয্যে বর্ণনায় যতি দিতে পারেন না। যা পারেন কেবলমাত্র কবি। সাধারণ প্রচারক শুধু বর্ণনার মধ্য দিয়ে যা তিনি প্রচার করতে চান তারই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করেন, তাই তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু কবি, তারও উদ্দেশ্য প্রচার। তবে তার সেই প্রচারের লক্ষ্য দল ভারী করা না। এখানে রয়েছে থাকে শুধু নিজেকে প্রকাশের তাগিদ, অনুভূতি ব্যক্তি করার আকাক্সক্ষা। এজন্য কবির বর্ণনায় ফুটে থাকে চমৎকারিত্ব।যা সাধারণের চোখে এতোটাই সুন্দর হয়ে ওঠে যে, একবার পাঠে তৃপ্তি মেটে না। এজন্য বারবার আগ্রহ পাঠের জাগে। প্রচারকের রচনার সঙ্গে এখানেই কবির রচনার পথ ভিন্ন হয়ে যায়। কবির বর্ণনা শক্তির ঔজ্বলে জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে তার রচনা। যার উদাহরণ সিকদার আমিনুল হকের (জন্ম: ৬ ডিসেম্বর ১৯৪২ মৃত্যু : ১৭ মে ২০০৩) কবিতা। 

সময় বিচারে তিনি বিংশ শতাব্দীর ষাট দশকের কবি। বাংলা কবিতার ধারাবাহিক পাঠক মাত্রেরই ধারণা রয়েছে এই সময় সম্পর্কে। রাজনীতির অস্থির করাঘাতে যখন ভেঙ্গে পড়ছে নিসর্গের সকল সৌন্দর্য, মুক্তির প্রতীক্ষা মানুষের চোখেমুখে, পাকিস্তানি শোষণের শেকল ভাঙার প্রস্তাব যখন আর দূরবাণী নয়, স্পন্দমান সেই সময় এবং তা থেকে উৎসারিত পংক্তিমালাই সাহিত্যের পথ নির্দেশ করছে। সেই সময়ে- সমস্ত চিৎকার ও স্লোগানকে দূরে সরিয়ে রেখে বিশুদ্ধ শিল্পের মীমাংসাকেই জয় করেছেন সিকদার আমিনুল হক। আমাদের পরিচিত পথ থেকে সযত্নে নিজেকে সরিয়ে, আলাদা পথের দিকে পৌঁছানোর প্রচেষ্টাই তাকে এনে দিয়েছে সার্থকতা। সাহিত্যের স্বাধীনতাকে স্বীকার করেছেন, যা তার অধীন তাকে সমকালীন অুতুৎসাহী চোখ দিয়ে বর্ণনা না করেও শিল্পের স্বাদ আনার বিশুদ্ধতাকে সিকদার আমিনুল হক প্রশ্রয় দিয়েছেন। তাই সময়ের ভেতর থেকে সময়কে ধারণ করলেও তার কবিতার স্বাদ ভিন্ন। তার পথ ভিন্ন। 

পাখির চেয়ে পাখির পালকের প্রসাধন                আজকাল বেশি টানে।

তোমার টিপের নীল, খয়েরির হতভম্ব নীরবতা            মুখস্থ করেছি-!

লাল ভালো নয়, বন্ধুদের কবিতার মতো উগ্র।          যেদিন পরছো ওই ছাই-রঙা; মৃত্যু এসেছিলো।

তুমি ভেবেছিলে এ তো হিম, নাকি এর ধারণাই পবিত্র!’

(একটি ঘটনা)

সমসাময়িক লেখকদের বর্ণনা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত জীবনে সিকদার আমিনুল হক ছিলেন নিভৃতচারী ও প্রচারবিমুখ। এই বিমুখতা ছিল বলেই, সাহিত্যের প্রতি যে দায়বদ্ধতা অনুভব করেছেন, সাহিত্যের জন্য যে ভালোবাসা তাকে লোভীর মতো ব্যবহার করতে চাননি। ফলে সাহিত্যের জন্য যে প্রেম, যে ভালোবাসা তাকে ধারণ করেই নিজেকে আশ্বস্ত করেছেন, কিন্তু কোনো উৎকণ্ঠা সেই ভালোবাসা ভাঙাতে যাননি। এতে করে তার কবিতারয় হৃদয়ের যে গভীরতম প্রদেশের উৎসারণ ঘটেছে, ভিড় ঠেলে সতর্ক পাঠক তা ঠিকই খুঁজে ফিরেছে। সিকদার আমিনুল হকের সপ্রতিভ বর্ণনা, ছদ্মবেশবিহীন উপস্থিতি যুুগের বাইরে এসে, সময়ের বাইরে এসে তাকে স্মরণীয় করে তুলছে। সাহিত্যের বিশুদ্ধতা রক্ষায় নিজের বিশ্বাস ও সাহিত্যশিক্ষাকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন বলেই সময় তাকে বিস্তৃতির অতলে তাকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। যদিও স্বকালে তিনি মূল্যায়িত হননি, মহৎ প্রতিভার করুণ পরিণতির মতো তাকেও স্বকাল চেনেনি। সে খেদও উঠে এসেছে, তার কবিতা ও কথায়। কবিতায় যেমন তিনি বলেছেন, ‘পুরস্কার আমার হয়নি/ কথিত মুদ্রার দোষে উচ্চারণ সবুজাভ বলে।’ তেমনিভাবে গদ্যে, এক সাক্ষ্যাৎকারেও সরাসরি বলেছিলেন, “আমার জীবনের অনেকটাই উপেক্ষার আর অন্ধকারের। সাধে কী আর একটি কবিতার বইয়ের নাম রেখেছি ‘বহুদিন উপেক্ষায় বহুদিন অন্ধকারে’।”

১৯৪৭ সালের পর, বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্য ধারা জন্ম নিতে শুরু করে। যার চূড়া ষাটের দশক। নিরীক্ষার পর্যায় অতিক্রম করে এ সময়ে দাঁড়িয়ে যায় শৈল্পিক প্রয়াসের চূড়ান্ত রূপ। শাসকের অস্বাভাবিক চরিত্র সাধারণের কাছে এ সময়ে স্পষ্ট হয়েছে, ভাঙনের সুর অনিবার্য হয়ে উঠছে প্রত্যেকের কাছে। এরও আগে লেখকদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে সকল অস্বাভাবিকতা। এতে করে ষাটের দশকের সাহিত্যে একটি বড় অংশ দখল করে রেখেছে রাজনীতি। সাহিত্যে, ভাষার শরীরে অনিবার্য ভাবে ফুটে উঠেছে সময়। কিন্তু সেই সময়ের বর্ণনা, সময়ের স্বীকৃতি অবশ্য সবার কাছেই সমান হয়ে দেখা দেয়নি। ষাটের দশকের কবিতায় যে রাজনীতি সচেতনতা তার প্রকাশও ব্যক্তিবিশেষে দেখা দিয়েছে ভিন্ন হয়ে।  স্লোগানমুখীতা এ সময়ের অনেকের কবিতায় ভর করলেও, সিকদার আমিনুল হক তা সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। 

কবিতার ভাষার সঙ্গে দৈনন্দিন ভাষার মোটা দাগে যে পার্থক্য রয়েছে, তা উপলব্ধি করেই তিনি কবিতার ভাষাকে বাঁচিয়ে তুলেছেন। নিরাসক্ত দৃষ্টিতে ফুটিয়ে তুলেছেন ব্যক্তির অনুভূতি। যাতে করে তার সময়ের কবিতার সঙ্গে তার কবিতার ফারাক স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন সমালোচকরা। শব্দ ব্যবহারে সিকদার আমিনুল হকের সচেতনতা তার নিজস্ব। অভিজ্ঞতা ও যুক্তিকে তিনি নিরাসক্ত হয়ে উপস্থাপন করেন, যতে করে মোহমুক্ত হয় তার ভাব, ভাষা ও ছন্দের বন্ধনে মিলিত বর্ণনা। ছন্দ সচেতন কবি হিসেবেও পরিচিত সিকদার আমিনুল হক। টানা গদ্যে যেমন তেমনি নিখুঁত ছন্দের কবিতাতেও  তিনি নিজের সংবেদশীলতা দেখিয়েছেন। সাহিত্যকে তিনি ভালোবাসেন, সেই ভালোবাসা ছিল ক্লান্তিহীন, বিরতিহীন পথিকের পথচলা। যাতে তার সংবেদনময় অনুভূতি পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা উজ্জ¦ল হয়েছে তাৎক্ষণিক সময়ের বর্ণনাতেও। বহিরঙ্গের চেয়ে, প্রজ্ঞা ও হৃদয়কেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন, তবে তা সাহিত্যবোধের বাইরে গিয়ে নয়। তার প্রতিবাদও তাই সাহিত্যের বিশুদ্ধতাকে স্বীকার করেই। এক্ষেত্রে ইন্দ্রিয় এবং মনকেও তিনি বিষ্ময়করভাবে সক্রিয় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। 

'সবাই চলেছে কাজে; আমার সহধর্মিণী সেও!            কিন্তু কী আমার কাজ? জানি না কোথায় পৌঁছবো;  উত্তর চল্লিশে পৌঁছে আজও এই মতিচ্ছন্নতার            বুঝি না উৎস কী যে, আমি নই জনপ্রিয়, লিখে          ঘরে বসে বই পড়ে, যে-গ্রন্থ হবে না ছাপা, তার আপাদমস্তক খুঁটে, পাণ্ডুলিপি ছড়িয়ে টেবিলে            কেন যে প্রহর যায় পরিণামহীন। সকলের                    এত কাজ, আকস্মাৎ আমি কেন এতটা স্বাধীন?

আমার সঙ্গীও আছে। এক কাক। তাকে ভয়ানক        স্তব্ধ মনে করি। বিরক্ত হয় না, কার্নিশেই বসে থাকে।নিতান্ত মাছের লেজ, পোড়া রুটি, বিস্কুটের গুঁড়ো      হৃষ্ট চিত্তে বেছে নেয়। কাজ শেষে আবার ঝিমোয়।  যান্ত্রিক বাঁচার কাজে এই একাগ্রতা, হতে পারে    চেষ্টাকৃত, জন্মলব্ধ, যা-ই হোক, কিন্তু তা নিশ্চিত।      এদিকে আমার কাজ প্রায়শই দুর্ঘটনা আর                দৈবের নির্ভর।- ক্রোধে বিদ্ধ হয়ে তাকে ঈর্ষা করি।'

(বেলা দশটার কবিতা)

সিকাদার আমিনুল হকের কবিতা কখনও অতিবর্ষণে ভারি হয়ে ওঠেনি। অতিপ্রসবের বেদনায়ও জর্জরিত নয়। যথাসময়ে যথাশব্দ প্রয়োগের মতোই তিনি ধরে রেখেছিলেন নিজেকে। ফলে পাঁচ দশকের সাধনায় তার বইয়ের সংখ্যা গোনা। প্রথম বই ‘দূরের কার্নিশ’ প্রকাশ পায় ১৯৭৫ সালে। এরপর প্রায় তিন বছরের বিরতি। দ্বিতীয় বই তিন পাপড়ির ফুল প্রকাশ পায় ১৯৭৯ সালে। ১৯৮২ সালের তৃতীয় কবিতার বই পারাবত এই প্রাচীরের শেষ কবিতা। আবারও প্রায় তিন বছরের বিরতির পর ১৯৮৫ সালে আমি সেই ইলেক্ট্রা, ১৯৮৭ সালে বহুদিন উপেক্ষায় বহুদিন অন্ধকার এবং পাত্রে তুমি প্রতিদিন জল। সাময়িক বিরতি আবারও। ১৯৯১ সালে এক রাত্রি এক ঋতু এবং সতত ডানার মানুষ। ১৯৯৩-এ সুপ্রভাত হে বারান্দা,

১৯৯৪-এ কাফকার জামা এবং সুলতা আমার এলসা। ১৯৯৫-এ রুমালের আলো ও অন্যান্য কবিতা, ১৯৯৭-এ লোর্কাকে যেদিন ওরা নিয়ে গেলো ২০০০-এ শ্রেষ্ঠ কবিতা এবং ২০০২-এ বিষন্ন তাতার ও ঈশিতার অন্ধকার শুয়ে আছে। এই মোট ষোলোটি কাব্যগ্রন্থ তিনি যোগ করেছেন বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে। তাকে উদ্ধার করতে আগাছা সরাতে হয় না। গুড়ি সরিয়ে যেতে হয় না মূল বৃক্ষের কাছে। জ্ঞানকে অনুভূতিরই অংশ করে তোলায় তার কবিতা অতিব্যবহৃত, রাজনীতিচর্চিত পংক্তির বাইরে এসে জ্বলজ্বল করে উঠেছে। '

'ঘাতকেরপদশব্দে দগ্ধ দিনে বৃষ্টির অভাবে            অকালে ঝরছে পাতা;এলোমেলো অস্থির সময়-        তুমি নেই,পার্শ্বচর তস্করের রাঙা সূর্যোদয়;              আমার একার কান্না বিষাদের নীরব আষাঢ়ে'

(আমি সেই ইলেক্ট্রা)

সিকদার আমিনুল হকের শিক্ষিত মননশীলতা বরাবরই নতুনত্ব খুঁজেছে। প্রকরণগত গতানুগতিকতার বাইরে এসে নিজেকে উপস্থাপন করতে চেয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি ক্লান্ত করে তোলেননি কবিতার ভাষা। কবিতার বর্ণনায় ব্যবহৃত রূপকল্প বা ছন্দ স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নেয়নি। কবিতার বিষয় নির্বাচনে কখনো কখনো তিনি একই বৃত্তে থেকেছেন, তবে তা নতুনত্বহীন না। ভাষাকে সরল করেছেন, বর্ণনাকে সহজ করেছেন, কিন্তু তাতেও তিনি দেখিয়েছেন নতুন পথ। যা তার সময়ের চেয়ে আশ্চর্যজনক তীক্ষè। সিকদার আমিনুল হক অভিজ্ঞতার পুঁজিকে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তাতে খাদ মেশাননি। শিল্পকে শিল্পের বাইরে নিয়ে আসেননি, বরং সুনিয়ন্ত্রিত শব্দের মাধ্যমে কবিতাকে জীবনেরই অংশ করে তুলেছেন। 

ষাটের দশকের কবিতায় সিকদার আমিনুল হক একক ও অনন্য। স্লোগানধর্মী কবিতার ভিড়ে তিনি এক নিঃসঙ্গ যাত্রী। যে একাকীত্ববোধ নিয়ে একাকী এগিয়েছে তার কবিতা, সেই পথই তাকে টেনে নিয়েছে আন্তরিক পাঠে। কবিতার কাছে যে দাবী পাঠকের সবসময়ের, তা হলো ভালোলাগা। সেই ভালোলাগার অনুভূতি ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে সিকদার আমিনুল হকের কবিতায়। তাই সময় যতো গড়াচ্ছে, তার সময় থেকে ততো এগিয়ে যাচ্ছে তার কবিতা, ততো বেশি পাঠকের কাছে আদরণীয় হয়ে উঠছেন তিনি।





Comments

Popular posts from this blog

কবি-প্রাবন্ধিক অমলেন্দু বিশ্বাস

সূ চি প ত্র